খাদ্যে ভেজাল নিয়ন্ত্রণে সরকারের জিরো টলারেন্স

বিটিবি নিউজ ডেস্ক: রমজানে যে কোন মূল্যে জনগণকে স্বস্তি দিতে বদ্ধপরিকর সরকার। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও খাদ্যে ভেজালরোধ করতে রমজানের প্রথম দিন থেকেই বিভিন্নস্থানে অভিযান চালিয়েছে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা। গত কয়েকদিন সতর্কতামূলক বার্তা দেয়ার পর প্রথম দিন থেকেই বিভিন্ন মনিটরিং টিম কাজ করছে। সরকারের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে যারা অতি মুনাফা অর্জনে খাদ্যে ভেজাল ও মূল্য কারসাজির মাধ্যমে বৃদ্ধির পাঁয়তারা করছে তাদের বিরুদ্ধে একশনে যেতে শুরু করেছে। খাদ্যে ভেজাল ও রমজানে মূল্যবৃদ্ধির বিষয়ে জিরো টলারেন্সে সরকার। ইতোমধ্যেই বিভিন্ন সংস্থা জরিমানা করছে অসাধু প্রতিষ্ঠানগুলোকে। আগামী দিনগুলোতেও এই ধারাবাহিকতা থাকবে। অসৎ ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে সরকারের এই আগাম সতর্কতা বার্তা ও রমজানের শুরু থেকেই ব্যবস্থা গ্রহণ নিয়ে খুশি সাধারণ মানুষ।

রমজান নিয়ে ইতোমধ্যেই নানা ধরনের অভিযানের মধ্যে অনেকটা আতঙ্কের মধ্যেই রয়েছেন অসাধু ব্যবসায়ীরা। হঠাৎ করেই বিভিন্ন সংস্থার অভিযান নিয়ে অতি মুনাফালোভী ব্যবসায়ীরা তটস্থ থাকছেন সবসময়। আর সাধারণ মানুষ সরকারের এই উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেছেন পুরো মাসটা এভাবেই অভিযান চলুক।

জানা গেছে, আসন্ন রমজানে নিত্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখতে কয়েকটি সংস্থাকে বাজার তদারকির দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে বাজারে খাদ্যপণ্যে বিশেষ করে ইফতারে কেউ যেন ভেজাল দিতে না পারে সে জন্য বিভিন্ন সংস্থা তদারকি কার্যক্রম চালু রাখার সিদ্ধান্ত হয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছেন, বিএসটিআই, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, সিটি কর্পোরেশনের বাজার মনিটরিং সেল, জেলা প্রশাসন বাজার মনিটরিং করবে। খুচরা বাজার থেকে শুরু করে দেশের পাইকারি ও মোকামগুলোয় অভিযান চালাবে, যাতে রমজানকে পুঁজি করে কারসাজির মাধ্যমে কেউ অতি মুনাফা লুটতে না পারে। সেই সঙ্গে এসব বাজার নজরদারি করা হবে বলে জানা গেছে। ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) কমমূল্যে বাজারে পণ্য বিক্রি করে বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করবে। এর বাইরেও র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত, কৃষি বিপণন অধিদফতর ও পুলিশ বাহিনী ভ্রাম্যমাণ টিম কাজ করছে বলেও জানা গেছে। উদ্যোগটি প্রশংসা করছে সাধারণ মানুষও।

শুরু থেকেই বিভিন্ন সংস্থা তদারকি শুরু করেছে বলে আরও বেশি আশাবাদী হয়ে উঠেছে সাধারণ মানুষ। সরকারের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রতি রমজানে নানামুখী কথা হয় তবে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস ওঠে। সরকারের ঊর্ধ্বতন মহল এবার শুরু থেকেই এ বিষয়ে কঠোর অবস্থানে রয়েছে। বাজারে পণ্যের ঘাটতিও নেই। যে কোন মূল্যে জনগণকে স্বস্তি দিতে চায়।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, গত মার্চের শেষে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশির রমজান মূল্য পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠকের মাধ্যমে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ রাখার বিষয়টি সামনে চলে আসে। এর পরে এপ্রিল পুরো মাসই বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে এ বিষয়ে একাধিক বৈঠক করে মূল্য না বাড়াতে এবং খাদ্যে ভেজালরোধ করতে নানা বার্তা দেয়া হয় সরকারের পক্ষ থেকে। এ ছাড়াও ধারাবাহিক রুটিন ওয়ার্ক হিসেবে নিয়মিতই বাজার তদারকি করছিল বিভিন্ন সংস্থা। রমজানের প্রথম দিন থেকে অভিযানের বিষয়টি আরও বেশি দৃশ্যমান।

এদিকে, রমজানের প্রথম দিনই বাজারে অভিযান চালিয়েছে কয়েকটি সংস্থা। র‌্যাব, জাতীয় ভোক্তা অধিকার, বিএসটিআই এবং সিটি কর্পোরেশনের বাজার তদারকির বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে। এসব সংস্থার কার্যক্রমে সাধারণ মানুষ এবার রমজানে বাজার নিয়ন্ত্রণে থাকা নিয়ে বেশ আশাবাদী হয়ে উঠেছে।

এদিকে রমজানের শুরুতেই অভিযান চালিয়েছে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। কামরাঙ্গীরচর এলাকায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালায় সংস্থাটি। এ সময় উৎসুক মানুষের মধ্যে বেশ সাড়া পাওয়া যায় অভিযান নিয়ে। সংস্থাটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মাহফুজুল হক বলেন, আমাদের এই মুহূর্তে দুটি টিম প্রতিদিনই অভিযানে কাজ করছে। সামনে আরও দুটি ম্যাজিস্ট্রেটের অধীনে দুটি টিম যুক্ত হবে। আমরা যেকোনো মূল্যে জনগণকে স্বস্তি দিতে চাই। সেটা বাজারের দ্রব্যমূল্য হোক বা খাদ্যে ভেজাল। আমাদের টিম সব বিষয়েই কাজ করবে।

খাদ্য কর্তৃপক্ষের মতো প্রথম রমজানে পুরান ঢাকায় অভিযান চালায় র‌্যাব। ভেজালবিরোধী সাঁড়াশি অভিযানে নেমেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে গঠিত স্পেশাল টাক্সফোর্স। প্রথম রোজায় চালানো র‌্যাবের অভিযানে আড়াই শ’ মণ পচা খেজুর জব্দ হয়েছে। এবার তাৎক্ষণিক তথ্যের ভিত্তিতেও ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালাতে পারবে। শুধু বাজারে নয়, সরাসরি গোডাউনেও অভিযান চলবে। আর ঢাকার খ্যাতিমান ইফতার বাজারে এবার চব্বিশ ঘণ্টা গোয়েন্দা নজরদারির ব্যবস্থা করা হয়েছে। আবার কোন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তরফ থেকে গোপনে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এবার খাদ্যে ভেজালকারীদের ন্যূনতম ছাড় দেয়া হবে না। জরিমানা দিয়ে পার পাওয়ার পর আবার ভেজাল খাদ্য তৈরি করায় এবার জরিমানার সঙ্গে ভেজালকারীকে জেল দেয়া হবে।

পহেলা রমজানে মঙ্গলবার দুপুর একটার দিকে বিএসটিআই ও র‌্যাব-৩ এর সহযোগিতায় ঢাকার বাদামতলীর খেজুরের আড়তে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালায়। অভিযানের নেতৃত্বদানকারী র‌্যাব সদর দফতরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম জানান, অভিযানে বিপুল পরিমাণ মেয়াদোত্তীর্ণ ও মানহীন খেজুর পাওয়া গেছে। স্বাভাবিক কারণেই পবিত্র মাহে রমজান উপলক্ষে সারাদেশে খেজুরের ব্যাপক চাহিদা থাকে। আর সেই চাহিদার সুযোগটিকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করে অসাধু ব্যবসায়ীরা। কারণ খেজুর হচ্ছে ইফতারের অন্যতম মূল উপাদান। এ সুযোগটাই নিচ্ছে অসাধু ব্যবসায়ীরা। তারা বাজারজাত করছে পচা ও মানহীন খেজুর। রমজানের আগেও পচা ও মেয়াদোত্তীর্ণ খেজুর মজুদ ও বিক্রির বিরুদ্ধে বাদামতলীতে অভিযান চালানো হয়েছিল। পুরো রমজানজুড়েই অভিযান চলবে। এবার খাদ্যে ভেজালকারীদের আর ছাড় দেয়া হবে না। জরিমানা দেয়া হলে টাকা পরিশোধ করে আবার ভেজাল ব্যবসায় নেমে পড়ে। এজন্য এবার জরিমানার পাশাপাশি জেল হাজতে পাঠানোর বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। যদিও সবই হবে আইন মোতাবেক।

র‌্যাবের লিগ্যাল এ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের উপ-পরিচালক মেজর রইসুল ইসলাম জানান, এবার ভেজাল বিরোধী সাঁড়াশি অভিযান চালাতে আরও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা এসেছেন। এবারের অভিযান হবে অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও সাঁড়াশি। ইতোমধ্যেই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে এ ব্যাপারে যোগাযোগ হয়েছে। ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ইফতারের বাজারগুলোতে এবার সার্বক্ষণিক মনিটরিং করার প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। আর তাৎক্ষণিক তথ্যের ভিত্তিতেও এবার কাছের ব্যাটালিয়ন অভিযান চালাতে পারবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রগুলো বলছে, এবার চকবাজার, ধানমণ্ডি, বেইলী রোড, গুলশান, বনানী, বারিধারা, উত্তরা কিংবা রাজধানীর যেকোনো জায়গায় তাৎক্ষণিকভাবে হাজির হবেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা। এবার অভিযান চালানোর সুবিধার্থে অনেক সময় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পোশাকে আবার সাদা পোশাকে হাজির হবেন। ফলে দেখে কারও বোঝার উপায় থাকবে না। আচমকা সব অভিযান চলবে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন বলেছেন, পবিত্র রমজান মাসে কোন ব্যবসায়ী যদি ইফতার সামগ্রীসহ খাদ্যে ভেজাল দেন কিংবা পঁচা-বাসি খাবার বিক্রি করেন তাহলে তাকে কারাগারে ঈদ কাটাতে হতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। প্রথম রমজানে মঙ্গলবার পুরান ঢাকার চকবাজারের ঐতিহ্যবাহী ইফতার বাজার পরিদর্শনে এসে মেয়র বলেন, শুধু জরিমানা নয়, নিয়মিত আইনে কারাদণ্ড দেয়া হবে অসাধু ব্যবসায়ীদের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *