নওগাঁ বিআরটিএ অফিস যেন ষ্টোর রুম

নওগাঁ বিআরটিএ অফিস যেন ষ্টোর রুম
নওগাঁ বিআরটিএ অফিসের কর্মকর্তার রুমের একটি দৃশ্য

মো. আব্দুল বারি খান, সম্পাদক ও প্রকাশক: নওগাঁ বিআরটিএ’র নির্ধারিত অফিস না থাকায় অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছে। নওগাঁ বিআরটিএ অফিসের নানা রকমের জরুরী ও জনগুরুত্বপূর্ণ কাজকর্ম চলছে জেলা প্রশাসনের দেয়া ছোট্ট দুটি রুম এবং লম্বা একটি করিডোরের মতো রুমের মধ্যে। রুম দুটি বাসাবাড়ির রান্না ঘরের চাইতেও ছোট। 
সরজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, জেলা প্রশাসন ভবনের নিচ তলার ছোট্ট ওই দুটি রুমের মধ্যে একটিতে নওগাঁ বিআরটিএ’র সহকারি পরিচালক (ইঞ্জিন) এ. টি. এম ময়নুল হাসান এবং অন্য রুমে মোটরযান পরিদর্শক মানস কুমার চক্রবর্ত্তী অফিসিয়াল কাজকর্ম করছেন। জায়গা না থাকায় সহকারী পরিচালক এবং মোটরযান পরিদর্শকের রুমের একই টেবিলে মেকানিক্যাল এসিস্ট্যান্ট মোহাম্মদ মিনহাজ উদ্দীনও তার কাজকর্ম করে যাচ্ছেন। সহকারি পরিচালকের রুমে ২দুটি ভিজিটর চেয়ার থাকলেও সেই চেয়ারে বসার পরিবেশ নেই। ১জন একটি চেয়ারে বসলে অন্য চেয়ারে বসতে চাইলে তাকে উঠে সরে ভিন্ন জায়গায় সরে গেলে-ই শুধু বসার সুযোগ রয়েছে। কারণ ওই ছোট্ট রুমের ভিতর এতো ফাইলপত্র জমা হয়েছে যা দেখলে পাহাড়ের মতো মনে হবে। চেয়ারও রাখার জায়গা নেই বললেই চলে। রুমে নড়াচড়ার মতো বা দাঁড়ানোর মতো তেমন জায়গাও নেই। সরকারী জনগুরুত্বপূর্ণ যত কাগজপত্র জমা হয়েছে সেখান থেকে কোন নথি বা ফাইল পত্র যদি বের করতে হয় তা হলে প্রায় কয়েক মাস লেগে যাবে। তাছাড়া ওই ফাইলপত্র বা জনগুরুত্বপূর্ণ নথিগুলো খুঁজে বের করা খুবই দুষকর। সহকারি পরিচালকের কক্ষে যে ফাইল কেবিনেট রয়েছে তা কাগজপত্রের স্তুপে ঢেকে গেছে। ওই রুমে সাচ্ছন্দ্যে সরকারি টেলিফোন রাখারও জায়গা নেই। সহকারি পরিচালকের একই টেবিলে ল্যাপটপ, কম্পিউটার, প্রিন্টারসহ বেশ কিছু ইলেকট্রনিক্স যন্ত্রাংশ এবং ফাইলপত্র রেখেই সেখানে সহিস্বাক্ষরসহ যাবতীয় কাজ করতে দেখা গেছে। 
আর মোটরযান পরিদর্শক মানস কুমার চক্রবর্ত্তীর রুমেও একই দশা। তার টেবিলের পাশে দুটি ভিজিটর চেয়ার রয়েছে। তার রুমেও ফাইলপত্র এমনভাবে থরে থরে সাজানো আছে। সেখানেও একই কায়দায় বসে অফিসিয়াল কাজকর্ম করছেন। রুম ও  জায়গা স্বল্পতার কারণে মোটরযান পরিদর্শকের একই টেবিলে মেকানিক্যাল এসিস্ট্যান্ট মোহাম্মদ মিনহাজ উদ্দীনও অধিকাংশ সময়ই তার দায়িত্ব বিরতিহীনভাবে পালন করে যাচ্ছেন।
করিডোরের মতো লম্বা রুমটির একাংশে হার্ডবোড দিয়ে একই জায়গায় ৩টি কম্পিউটার বসিয়ে ঠাসাঠাসি করে কাজকর্ম করছেন অফিস স্টাফ সাহাজাহান, মাজেদুল ইসলাম এবং ওহিদুর রহমান। আর ওই রুমের লম্বালম্বিভাবে জানালার সাইড দিয়ে ৩/৪জন একই কায়দায় কাজ করে যাচ্ছেন। তারা হলে অফিস ষ্টাফ আঙ্গুর হোসেন, এমদাদুল হক, আবুল হোসেন। রুমের বাহিরে খালেকুজ্জামান রিপন বারান্দায় ১টি টেবিল চেয়ার নিয়েও বিআরটিএ আসা গ্রাহকদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। জায়গা সংকুলান এবং পর্যাপ্ত রুম না থাকার কারণে বিআরটিএ’র কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দীর্ঘদিন ধরে তাদের চোখে মুখে অসহায়ত্বের ছাপ নিয়ে সরকারি দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন বলেও বিটিবি নিউজের অনুসন্ধানের আয়নায় উঠে এসেছে। কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টির দিকে বারবার হাতছানি দিয়ে ডাকছে অযতেœ জরাজির্ণের চাদরে ঢাকা পড়ে থাকা ওই সকল ফাইলপত্র/নথিপত্র/কাগজপত্রগুলো। কর্তৃপক্ষের সুনজরে না আসলে কিংবা কর্তৃপক্ষ জরুরী ভিত্তিতে কোন পদক্ষেপ না নিতে পারলে বহুগুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র/ফাইলপত্র/নথিপত্র নষ্ট হওয়ার আশু সম্ভাবনা রয়েছে। তাছাড়া এ অবস্থায় থাকলে অনাকাঙ্খিতভাবে এক ফাইলের কাগজপত্র অন্য ফাইলে ঢুকে গেলে গ্রাহকগণ আর কোন দিন তা পুশিয়ে নিতে পারবে না বলেও জানা গেছে। এমতাবস্থায় কোন গ্রাহকের পুরানো ফাইল পত্র প্রয়োজন হলে তার হয়রানির শেষ নেই। কারণ অফিসের রুম বড় না হওয়ায় এবং কর্মের টেবিল চেয়ারের চর্তুরদিকে ফাইলপত্র এমনভাবে সাজানো আছে যেন দিনে দিনে নথিপত্রের পাহাড় সাজানো হচ্ছে। কোন কোন সময় মোটর মালিকের মালিকানা পরিবর্তনের জন্য আবেদন করতে হয়।  আর সেই ক্ষেত্রে মূল নথির প্রয়োজন হয়। তখনই গ্রাহকের মাথায় হয়রানির বাস পড়ে। কর্তৃপক্ষ সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা দেখালেও আলাদা ষ্টোর রুম, বসার রুম না থাকাসহ নানা কারণেই গ্রাহকদের হয়রানি চরমসীমায় পৌঁছেছে বলেও বিটিবি নিউজের অনুসন্ধানের আয়নায় উঠে এসেছে। আরো জানা গেছে, সরকারি নিয়মে অফিস শুরু হলেও যাওয়ার সময় নিয়ম মানতে হীমশীম খেতে হয় কর্মকর্তা কর্মচারীদের। কারণ তাদের অধিকাংশ সময়ই গ্রাহকদের সেবা প্রদানে প্রায় দিন-ই রাত পর্যন্ত অফিসিয়াল কাজকর্ম করতে হয়। আবার অফিসের দায়িত্ব প্রাপ্ত অনেকেই অফিস ছুটির দিনেও চলমান অফিসের দিনের চাইতে বেশি কাজ করতে হয় বলেও একটি অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। জনবল কম থাকায় বৃহত্তর জেলার মানুষদের সেবা প্রদানে তাদেরকে বিরতিহীনভাবে কাজ করতে হয়।
নওগাঁ জেলা বিআরটিএ অফিসে সরকারি রাজস্ব আদায় বহুগুণে বেড়েছে। বিগত সময়ে ডিসি, এডিসিসহ অনেকেই বিআরটিএ’র ওই করুন দশা দেখলেও সহানুভূতির ছোঁয়া এখনও লাগেনি। অথচ জেলা প্রশাসনের এলারফান্ডে নওগাঁ বিআরটিএ অফিসের গ্রাহদের অনেক টাকাই জমা হয়েছে বলেও একটি সূত্রে জানা গেছে। বৃহত্তর এ জেলায় বিআরটিএ অফিসে বিভিন্ন কারণে মানুষ দূর দুরান্ত থেকে এসে অনেকেই হয়রানি ও হতাশার প্রলেপ চোখে-মুখে লাগিয়ে ফিরে যেতে হয়। জেলা সদর থেকে পশ্চিম দিকে সর্বশেষ উপজেলা পোরশার দূরত্ব প্রায় ৯০ কিলোমিটার আর উত্তর-পশ্চিমে ধামুরহাট উপজেলার দূরত্ব প্রায় ৬৫/৭০ কিলোমিটার। এ সকল এলাকাসহ জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে কোন কোন গ্রাহক কাজ করতে এসে নানা কারণে বিড়ম্বনার স্বিকার হন বলেও সেবা নিতে আসার ভুক্তভোগীরা জানান।
নওগাঁ বিআরটিএ’র সহকারি পরিচালক (ইঞ্জিন) এ. টি. এম ময়নুল হাসান এর  সঙ্গে কথা হলে তিনি বিটিবি নিউজকে জানান, সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সাথে আমরা গ্রাহকদের সেবা প্রদান করছি। কিন্তু আমাদের কাজে ব্যবহৃত ছোট ছোট রুমের কারণে কাজকর্ম করতে হিমশীম খেতে হচ্ছে। অতিরিক্ত রুম না থাকায় অনেক কষ্ট করে রুমের বিভিন্ন অংশে ফাইল/নথি/কাগজপত্র স্তুপাকারে সাজিয়ে অফিসিয়াল কাজকর্ম করতে হচ্ছে। এ যেন এক ষ্টোর রুম। নওগাঁ বিআরটিএ’র নির্ধারিত জায়গা না থাকার করণে এসব হচ্ছে। তবে জেলা প্রশসনের সুদৃষ্টি এবং সরকারের এ দপ্তরের কাজের স্বার্থে প্রয়োজনীয় রুম দিয়ে সহযোগিতা করলে গ্রাহকদের সেবা দেয়া আরো সহজতর হবে। 
নওগাঁ বিআরটিএ’র কার্যক্রমের গতি বৃদ্ধি ও জনআকাংখাপূরণে গ্রাহকদের সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা খুবই জরুরি। দ্রুততার সাথে জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কিংবা উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ এর সুব্যবস্থা না করলে বিআরটিএ’র গ্রাহকসহ অফিসিয়ালী অনেক ফাইলপত্র/নথিপত্র/কাগজপত্র সংরক্ষণের অভাবে নষ্টসহ এলোমেলো হয়ে চরম বিড়ম্বনার সন্মুখিন হওয়ার আশংকা রয়েছে। উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের মহতি উদ্যোগেই সৃষ্ট সমস্যার সমাধান করা সম্ভব ও সহজতর হবে। তা-না হলে গ্রাহকদের পুরানো ফাইল/কাগজপত্র/নথিপত্র নষ্ট বা এলোমেলো হয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হবে। যা গ্রাহকগণ কোনভাবেই তা আর পুশিয়ে নিতে পারবেনা বলেও অনেকের-ই ধারনা।