অসৎ রাজস্ব অফিসার ৩০ হাজার টাকার মিষ্টি খেলেন!

অসৎ রাজস্ব অফিসার ৩০ হাজার টাকার মিষ্টি খেলেন!

মো. আব্দুল বারি খান: কোন অফিসেরই সকল অফিসার অসৎ বা খারাপ নয়। দু’একজন অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কারণে পুরো অফিসের ভাল ভাল অর্জনগুলো ম্লান হয়ে যায়। সেই সাথে সরকারেরও বদনাম হয়। সরকার যায়, সরকার আসে। আবার অফিসের অফিসার বদলি হয়; সেখানে অন্য অফিসার এসে যোগদান করে এটাই নিয়ম। কখনও কখনও সমাজে অসৎ ব্যক্তি ও অসৎ নেতারা অসৎ উদ্দেশ্যে অফিসারদের ব্যবহার করে থাকে। নওগাঁর রাজস্ব অফিসের অসৎ কর্মকর্তারা ঘুষ নেয়ার কারণে সরকারের রাজস্ব অদায়ের লক্ষনীয় হারে বাড়ছেনা। 
বিটিবি নিউজের অনুসন্ধানের আয়নায় জানা গেছে, অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মাঠ পর্যায়ে গিয়ে ঘুষ লেন দেনের কারণে একদিকে ইট ব্যবসায়ীরা একসাথে পুরো টাকা দিচ্ছেনা। অন্যদিকে ঘুষের নামে অতিরিক্ত টাকা দিতে গিয়ে তারা অতিষ্ট হয়ে উঠেছে। তাদের ভ্যাটের টাকার আদায়ের পাশাপাশি অতিরিক্ত টাকা ঘুষ হিসেবে আদায়ে লিপ্ত রয়েছে অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মাঠ পর্যায়ে গিয়ে ওঁত পেতে থাকে। কখন তাদের ইটের গাড়িগুলো রাস্তা বা ভাটায় পাওয়া যায়। রাস্তা বা ভাটায় গাড়ি পেলেই শুরু হয় অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঘুষ বাণিজ্যের দরকষাকষি। তাদের চাহিদা মাফিক ঘুষের টাকা না পেলে গাড়ি আটক করে নিয়ে আসাসহ নানা হয়রানির স্বীকার হয় ব্যবসায়ীরা। ইটভাটার মালিকদের তো ভ্যাট ট্যাক্সের পুরো টাকাই একসময় গুনতে হয়। তারা সময় মতো তাদের টাকা দিতে না পারায় অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছে ওই সকল ঘুষ দিতে হয়। অসৎ কর্মকর্তা কর্মচারীরা কখনও মিষ্টি খাওয়ার নামে আবার কখনও গাড়ির তেল খরচের নামে ওই সকল ঘুষ নিয়ে থাকে। এতে করে সরকারের রাজস্ব আদায়ে বাধা গ্রস্থ হচ্ছে বলেও আপাতত দৃষ্টিতে মনে হচ্ছে। 
গত ২৫ জুনের একদিনের একটি ঘটনায় জানা গেছে, ওই দিন নওগাঁ রাজস্ব অফিসের সহকারি রাজস্ব কর্মকর্তা শফিকুল ও জাহিদুলসহ ৪/৫জনের একটি টিম মান্দা উপজেলার কয়েকটি ইট ভাটায় যায়। তারা উপজেলার ১২নং কাঁশোপাড়া ইউনিয়নে অবস্থিত সাদেকুলের ইটভাটায় গিয়ে একটি গাড়িতে ভাটার ইটগুলো ওঠানোর সময় উপস্থিত হয়ে গাড়িটি আটক করে রাস্তায় ঘুরাতে থাকে এক পর্যায়ে গাড়ির মালিকের কাছ থেকে মিষ্টি খাওয়ার নামে ৩০ হাজার টাকার বিনিময়ে বিষয়টি দফারফা হয়। আবার ১২নং কাঁশোপাড়া ইউপি চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান মোল্লার ইটভাটা থেকে তার ভাটার হিসেবের খাতাপত্রসহ বেশ কিছু প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তারা কোন প্রকার ডকুমেন্টারি না দিয়েই জোরপূর্বক নিয়ে আসে। একই দিনে ওই ইউনিয়নের আরো একটি ইটভাটার একটি গাড়ি রাস্তায় আটক করে তাদের তেল খরচের নামে ২ হাজার টাকা ঘুষ নিয়েছে বলেও বিটিবি নিউজের ওই অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
বিটিবি নিউজের অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, ওই সাদেকুলের সাদেক ব্রিক্স প্রায় ২/৩ বছর যাবৎ ভ্যাটের টাকা বকেয়া আছে। তারপরও ঘুষের টাকা নিয়ে গাড়ি ছেড়ে দিয়ে অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা চলে এসেছে। অথচ সাইদুর চেয়ারম্যান তার ভাটার ভ্যাটের টাকা একাংশ দেয়ার পরও তার খাতাপত্রসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে গেছে। 
অন্যদিকে মান্দার আরো একটি ইটভাটার ছোট ৩০টি টালি খাতা এবং বড় ৩টি টালি খাতা ২০১৮সালে জব্দ করলেও সেই ভাটার মালিক দফায় দফায় টাকা দিলেও আজ অবদি সেই খাতাপত্রগুলো ফেরত পায়নি। যার দরুন ওই ভাটার মালিক ব্যাপকভাবে আর্থিক ক্ষতির সন্মুখিন হয়েছে বলেও জানা গেছে। আগামী কোন এক পর্বে এব্যাপারে বিস্তারিত আসছে। বিটিবি নিউজে চোখ রাখুন। 
নওগাঁ রাজস্ব অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সহযোগীতা না করার কারণে সরকারের রাজস্ব আদায়ের অনেক তথ্যই তুলে ধরা যাচ্ছে না। তবে তারা যদি সহযোগীতা করেন তাহলে সরকারের রাজস্ব আদায়ের অনেক চিত্রই তুলে ধরা সহজতর হবে। সেই সাথে জনসচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সরকারের অর্জনগুলোর সুনামের পাল্লা আরো ভারী হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাদেক ব্রিক্সে ধরা গাড়ির মালিক এর সঙ্গে মুঠোফোনে বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বিটিবি নিউজকে জানান, কেউ প্রতিকার করে না। অনেকে টাকা খেয়ে স্বার্থসিদ্ধির জন্য ভুলে যায়। যার জন্য আমরা ক্ষতিগ্রস্থ হই। তিনি বলেন, সাদেক ব্রিক্সের ২/৩ বছরের ভ্যাটের টাকা বকেয়া আছে। তার গাড়ি আটক এবং ক্ষতিগ্রস্থের হাত থেকে রক্ষা করার স্বার্থেই রাজস্ব অফিসের ওই অফিসারদের ৩০ হাজার টাকার বিনিময়ে গাড়িটি ছাড়িয়ে নিই। তিনি আরো জানান, সাইদুর চেয়ারম্যানের ৩টি গাড়ি আটক করার পর কিস্তিভাবে প্রায় ৭৫ শতাংশ টাকা পরিশোধ অন্তে প্রায় ১৮মাস পরে ঘুষের টাকা নিয়ে গাড়িগুলো ছেড়ে দেয়।  
ইট ভাটার মালিক ও ইউপি চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান মোল্লা বিটিবি নিউজকে জানান, আমি দীর্ঘদিন ধরে ইটের ব্যবসা করে আসছি। ভ্যাট-ট্যাক্সের টাকাও বিভিন্নভাবে দিয়ে আসছি। তবে কিছু টাকা বাঁকি আছে পরিশোধ করা হয়নি। পরিশোধ না হওয়ার কারণে ওই দিন রাজস্ব অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা (৪/৫জন) আমার ভাটায় এসে হিসেবে খাতাপত্রসহ বেশ কিছু প্রয়োজনীয় কাগজপত্র কোন প্রকার প্রমানাদি না দিয়েই জোরপূর্বক নিয়ে গেছে। করোনা কালীন সময় আমি খুব অসুস্থ অবস্থায় বাসা ছিলাম আমার ইট ভাটার দায়িত্ব প্রাপ্ত ব্যক্তির কাছ থেকে তারা ওইগুলো নিয়ে গেছে। আমি ফোনে খাতাপত্রসহ কাগজপত্রগুলোর নেওয়ার জন্য  তাদের কাছে অনেক অনুরোধ করলে তারা আমাকে কোন কিছু ফেরত দেননি। এর কারণে আমার ভাটার বকেয়া টাকা তুলতে এবং হিসেবে করতে অনেক কষ্ট হয়েছে। যার দরুন আমি ব্যবসায়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছি। তিনি আরো বলেন, বিগত সময়ে আমার ভাটার গাড়িগুলো রাজস্ব অফিসের কর্মকর্তারা আটক করে নিয়ে গেলে টাকা জমা দেয়ার পরও অনেক ঘুরাঘুরি করে অবশেষে ৩০ হাজার টাকার বিনিময়ে গাড়িগুলো ছেড়ে দিয়েছে। 
ক’ জনের সঙ্গে মুঠোফোনে জানান, ওই দিন রাজস্ব অফিসের লোকজন এসে জামালের গাড়ি ধরে তার নিকট থেকে ৩০ হাজার টাকা নিয়েছে। সাইদুরের ভাটা থেকে খাতাপত্র সব নিয়ে গেছে। আবার অন্য একটি ভাটার গাড়ি আটক করে ৪/২০ হাজার টাকা নিয়ে ছেড়ে দিয়ে চলে গেছে। 
সহকারি রাজস্ব কর্মকর্তা শফিকুলের সঙ্গে মুঠোফোনে বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে ঘুষ নেয়ার কথা অস্বিকার করে তিনি বিটিবি নিউজকে বলেন, এগুলো ভূয়া নিউজ। টাকা নেইনি। অফিসে এসে বিস্তারিত আলাপ করেন। আমি তো একাই অফিসার নয়। আমার সাথে তো কথা বললে হবে না। আমার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলতে হবে। অপর প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, হ্যাঁ; ইটভাটার ভ্যাট ট্যাক্সের অনেক টাকা বাঁকী আছে তাই তার কাগজপত্র নিয়ে এসেছি। আপনি তো সবই জানেনই। তিনি আরো বলেন, বিগত ১০/১২ বছর ধরে তার ভাটার ভ্যাট ট্যাক্স দেয় না সে। ১৬/১৭/১৮ লক্ষ টাকা বাঁকি তার। গত বছরে সে ৩ লাখ ৯৬ হাজার টাকা দিয়েছে। গাড়ি ধরে তার সে টাকা আদায় করতে হয়েছে।
অন্য প্রশ্নের জবাবগুলোতে তিনি এড়িয়ে গিয়ে সহকারি রাজস্ব কর্মকর্তা জাহিদুলের সঙ্গে কথা বলা জন্য ফোনটি তার নিকট হস্তান্তর করেন। জাহিদুল এক পর্যায়ে বলেন, শোনেন যা খুশি নিউজ করেন। আপনারা আমাদের নামে নিউজ করেন, ১০১ বার নিউজ করেন কোন সমস্যা নাই। আমরা আপনার নিউজ করার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা নিউজ অনুসারে ফেস করব। অপর প্রশ্নের জবাবে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন, আরে এগুলো আলাপ করেননা এগুলো আমরা বহুত ফেস করে আসছি। তিনি আরো রাগান্বিত হয়ে বলেন, যমুনা টিভিতে নিউজ হয়েছে লাখ লাখ। এখানে আমাদের ভয় দেখায়েননা, আমরা জানি।
ঘুষ নেয়ার ব্যাপারে সহকারি রাজস্ব কর্মকর্তা জাহিদুলের নিকট জানতে চাইলে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে বিটিবি নিউজকে আরো বলেন, আপনি কি দেখেছেন? অযথা আপনি এগুলো ঝামেলায় পড়েন না। যারা ট্যাক্স দেয়না তাদের ব্যাপারে ল্যাখেন। সরকারের ট্যাক্স আদায়ে সহযোগীতা করেন। সে ক্ষেত্রে আপনার জন্যে ভাল হবে। আপনি কি দেখেছেন? আপনার কাছে কি প্রমাণ আছে বলে নানাভাবে অসৌজন্যমূলক কথা বলেন। তিনি আরো বলেন, যমুনা টিভিতে লাখ লাখ নিউজ হয়েছে। কিছুই হয়নি। আপনি যত খুশি করেন।
বিষয়টি নিয়ে জেলা রাজস্ব কর্মকর্তা লুৎফর রহমানের সাথে মুঠোফোনে জানতে চাইলে তিনি এমনভাবে কথা বলছিলেন মনে হচ্ছিল কোন দরবেশের সাথে কথা হচ্ছে। তিনি মোবাইলে কোন তথ্য দিতে রাজি নয়। স্ব-শরিরে গিয়ে তার অফিস থেকে যেকোন তথ্য সংগ্রহ করার অনুরোধ করেন। সেই অনুযায়ী বিটিবি নিউজের সম্পাদক ও প্রকাশক তার অফিসে গিয়ে পরিচয় দিতেই তিনি বলেন আপনার মুখের মাক্স খোলেন আপনার চেহারাটা একটু দেখি। পরিচয় দেয়ার পরও তিনি বলেন, আপনি কি ইটভাটার মালিক না-কি? এরপর তিনি তার নিজের সাংবাদিকতার গুণর্কীত্তন শুরু করলেন। সেটি শুনার মাঝে তার সহকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীর তথ্য জানতে চাওয়া মাত্রই তার আচরণে মনে হলো গরম তেলের উপর পানি পড়েছে। তিনিও কি অসৎ কর্মকর্তা কর্মচারীদের কাতারের লোক? কোন ভাবেই তিনি কোন কথা বা তথ্য দিতে রাজি নয়। তিনি বলেন nbr.gov.bd  এই ঠিকানায় সব পাবেন। অন্য প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আর বিরক্ত করবেন না। আপনি যা চাইবেন সবই সেখানে পাবেন বলেই তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে চেয়ার থেকে দাঁড়িয়ে তার স্টাফদের ডাকাডাকি করতে থাকে এবং অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন।
সরকারের রাজস্ব আদায় যে হচ্ছেনা তা নয়। তবে আদায়ের পরিমাণ বেশ কম। ঘুষ বাণিজ্য বন্ধ হলে এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যবহার সন্তোষজনক, পরিশ্রমী ও আন্তরিক হলে সরকারের এ দপ্তরে রাজস্ব আদায় ব্যপকহারে  বৃদ্ধি পাবে বলেও বিটিবি নিউজের একটি অনুসন্ধানের আয়নায় উঠে এসেছে। অসৎদের ঘুষ বাণিজ্য ও  খারাপ আচরণগুলো মানুষের কানে ভেসে বেড়াচ্ছে। অসৎ দু/চার জন কর্মকর্তা- কর্মচারীর কারণে এ প্রতিষ্ঠানের বদনামের পাল্লা দিন দিন ভারী হচ্ছে। অন্যদিকে সরকারের অর্জনের পরিমাণ অনেক বেশি হলেও অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কারণে সরকারের নিরব বদনামও হচ্ছে। অসৎদের সুধরিয়ে উৎকৃষ্টমানের মানব সম্পদে রূপান্তর করতে পারলেই ওই সকল দপ্তরসহ সরকারের উন্নয়ন ও  অর্জনগুলো মানুষের হৃদয়ে ভেসে বেড়াবে। সেই সাথে অনন্য উচ্চতায় এগিয়ে যাবে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ। 
চলবে......................