২০ হাজার কোটি টাকায় হবে নতুন রিফাইনারি

২০ হাজার কোটি টাকায় হবে নতুন রিফাইনারি

নিউজ ডেস্ক: দাতাদের জন্য সাত বছর প্রতীক্ষার পরও তাদের সাড়া মেলেনি। অপরিশোধিত জ্বালানি তেল প্রক্রিয়াকরণের জন্য ইনস্টলেশন অব ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) ইউনিট-২ স্থাপনে টাকার জন্য দাতা খোঁজা হচ্ছে সেই ২০১৫ সাল থেকে। এখন নিরাশ হয়ে নিজস্ব অর্থায়নে ১৯ হাজার ৭৬৯ কোটি টাকা খরচে বাস্তবায়নের জন্য পরিকল্পনা কমিশনের কাছে প্রকল্প প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। ৩০ লাখ মেট্রিক টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল প্রক্রিয়ার সক্ষমতা অর্জনে এই বিশাল অর্থ ব্যয়ের প্রস্তাব। তবে প্রস্তাবে ১৮৪ জন কর্মকর্তার বিদেশে প্রশিক্ষণের ব্যাপারে আপত্তি জানিয়ে এটাকে যৌক্তিক পর্যায়ে কমিয়ে আনার জন্য বলেছে পরিকল্পনা কমিশনের শিল্প ও শক্তি বিভাগ।
বিপিসির প্রস্তাবনা থেকে জানা গেছে, ইআরএল বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) একটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান। সরকারি খাতে দেশের একমাত্র পেট্রলিয়াম অয়েল রিফাইনারি প্রতিষ্ঠান। ১৯৬৮ সাল থেকে উৎপাদন শুরু করে এটি। বার্ষিক ক্রুড অয়েল প্রক্রিয়াকরণ ক্ষমতা ১৫ লাখ মেট্রিক টন। এটা বৃদ্ধি করে ৪৫ লাখ মেট্রিক টনে নেয়ার প্রয়াস হাতে নেয়া হয়েছে। যার জন্য রিফাইনারির বিদ্যমান প্রাঙ্গণে ইনস্টলেশন অব ইআরএল ইউনিট-২ নামে নতুন প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে। বর্তমান রিফাইনারিটি প্রায় ৫০ বছরের পুরনো। এতে পরিশোধিত পেট্রলিয়ামজাত পণ্য বর্তমান সময়ের গুণগত মানে উন্নীত করা প্রয়োজন। দেশের বর্তমান জ্বালানি তেলের চাহিদার মাত্র ২৫ ভাগ ইস্টার্ন রিফাইনারি পূরণ করে থাকে। বাকি ৭৫ শতাংশ বা ৪০ লাখ মেট্রিক টন তেল আমদানির প্রয়োজন হয়। এ ছাড়া বর্তমানে রিফাইনারিতে উৎপাদিত কেরোসিন ও ডিজেল আন্তর্জাতিক মানের না হওয়ায় তা নতুন রিফাইনারিতে প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানের বা ইউরো-৫ মানে উন্নীত করতে হবে। আর এ জন্যই ইনস্টলেশন অব ইআরএল ইউনিট-২ স্থাপন ও বাস্তবায়ন জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, প্রকল্পটি আরো আগেই তৈরি করা হয়েছে। তখন এটি স্থাপনের জন্য ব্যয় প্রস্তাব করা হয় ১৬ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা। যার মধ্যে সরকারি অর্থায়ন পাঁচ হাজার কোটি টাকা আর ১১ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা প্রকল্প সাহায্য খাতে ধরা হয়েছে। কিন্তু ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) বৈদেশিক সাহায্য প্রাপ্তির সুবিধার্থে অননুমোদিত নতুন প্রকল্পের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত রাখা হয়। একই ভাবে পরের বছরও। প্রকল্প সাহায্যের জন্য প্রচেষ্টা চলমান থাকায় প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়। প্রকল্প সাহায্যের স্থানে ব্যাংকঋণ উল্লেখ করা হয়। কিন্তু গত সাত বছরে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) দাতা সংস্থাকে রাজি করাতে পারেনি।
প্রকল্পের আওতায় প্রধান কার্যক্রমগুলো হলো, সাইট প্রিপারেশন, ডিটেইল ইঞ্জিনিয়ারিং, প্রকিউরমেন্ট, কনস্ট্রাকশন, পিডিবি থেকে ইলেক্ট্রিক্যাল লাইন সংযোগ নেয়া, প্রকল্পের জন্য প্রাকৃতিক গ্যাস লাইনের সংযোগ নেয়া। এ ছাড়া সড়ক রি-রুটিং, প্রশাসনিক-আবাসিক অন্যান্য ভবন নির্মাণ করা, নিকাশ কাঠামো নির্মাণ, যানবাহন ক্রয়, কম্পিউটার ও আনুষঙ্গিক অফিস সরঞ্জমাদি ও আসবাবপত্র কেনা হবে।
পরিকল্পনা কমিশনের শিল্প ও শক্তি বিভাগ প্রকল্পের প্রস্তাবিত ব্যয় পর্যালোচনায় বলছে, এই ইউনিট স্থাপনের জন্য দরকার হচ্ছে ১২৩.১২৭ একর জমি। আর এই জমির মধ্যে ৫৯ একর জমি ইস্টার্ন রিফাইনারিতে খালি পড়ে আছে। লিজ নিতে হবে ৬৪ দশমিক ১২৭ একর। যার মধ্যে জেনারেল ইলেক্ট্রনিক ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের ৪৫ একর, পদ্মা ওয়েলের ১১.৬২৭ একর এবং সরকারি খাস জমি সাড়ে সাত একর। প্রকল্পের স্থায়িত্বকাল ধরা হয়েছে ২০ বছর। কিন্তু জমি লিজ নেয়া হচ্ছে ৪০ থেকে ৯০ বছর।
১৮৪ জন জনবলকে বিদেশে প্রশিক্ষণের ব্যাপারে আপত্তি জানিয়ে শিল্প ও শক্তি বিভাগ বলছে, বৈদেশিক প্রশিক্ষণের বিষয়ে যেহেতু অর্থ বিভাগ থেকে বর্তমানে একটি নির্দেশনা জারি করা হয়েছে তাই পরিমাণটি যৌক্তিক পর্যায়ে কমিয়ে আনতে হবে। এখানে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩৮ কোটি টাকা। ব্যাংক চার্জ ৪৭২ কোটি টাকা প্রাক্কলনকে যৌক্তিকভাবে কমাতে হবে। এ ছাড়া কারখানা ইন্সপেকশন উপখাতে ১৬টি মিটিং বাবদ ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকা। পাঁচটি যানবাহনের জ্বালানি খরচ ৯০ লাখ টাকা। কেমিক্যাল, ক্যাটালিস্ট, এডিটিভস ও লুব্রিকেন্ট খাতে ব্যয় ২০২ কোটি টাকাকে যৌক্তিক পর্যায়ে কমিয়ে আনতে বলছে পরিকল্পনা কমিশন।
শিল্প ও শক্তি বিভাগের উপপ্রধান বলছেন, অন্যান্য মূলধন ব্যয় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার বেশি, স্থাপনাদি নির্মাণ ব্যয় ৫ হাজার ২৫ কোটি টাকা। এসবের কোনো বিস্তারিত বিভাজন দেয়া হয়নি। ১২৯ কোটি ২৭ লাখ টাকা ভূমি উন্নয়ন ব্যয়কে যৌক্তিক বলে এটাকে কমিয়ে আনার জন্য বলছে কমিশন। ভবনে বিদ্যুৎ সংযোগ খাতে খরচ ১৩৫ কোটি ৫৫ লাখ টাকাকে অত্যাধিক বলে মনে করছে তারা।
এ ব্যাপারে ইআরএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো: লোকমানের সাথে রাতে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি নয়া দিগন্তকে জানান, এখানে দাতাদের অর্থায়ন নেই। শতভাগ বিপিসির অর্থায়নে হবে এই মর্মেই আমরা প্রকল্প প্রস্তাবটা পরিকল্পনা কমিশনে জমা দিয়েছি। তিনি বলেন, প্রকল্পটি এখনো অনুমোদন হয়নি। আগামী ২৪ আগস্ট এটার মূল্যায়ন কমিটির মিটিং হবে। সেখানে বেশ কিছু বিষয়ে আমাদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে। সেগুলোর জবাব দেয়ার জন্য আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি। বিরাট অঙ্কের জনবল বিদেশে প্রশিক্ষণের ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে মো: লোকমান বলেন, এটার পরিমাণ আরো বেশি ছিল। এখন ১৮৪ জন করা হয়েছে।